স্বগোক্তি
- Subrata Shuvro
- Jun 25, 2022
- 2 min read
আমার বিরুদ্ধে বড় একটা অভিযোগ পেশা-নেশায় আমি থিতু না, অনেকটাই ঠিক। কোনো আটকানো পরিবেশ আমি সহ্য করতে পারি না বলে জীবনে ক্রিয়েটিভ জব এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাটাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আদর্শিক দ্বন্দের কারনে ছেড়েছি নিজের হাতে গড়া সংগঠন, যে সংগঠনের সামাজিক ও প্রান্তিক উন্নয়নমূলক কাজের স্বার্থে নিজের ব্যক্তিগত সমস্ত কিছুকেই উপেক্ষা করেছি জীবনভর। আমার জ্ঞান সুগভীর নয় তবে চলন গভীরতার খোঁজে। যেহেতু ইন্সটিন্ক্টলি আমি ভবঘুরে, তাই খেয়াল রেখেছি কোথাও যেন শিকড় না ছড়ায়। জীবনের বিশাল সায়রের মাঝে কচুরি পানার মতো ভাসমান আমি, ভবঘুরেমি জীবনে সবকিছু একটু দেখায় জীবনে তৃপ্তি আছে।
এ সমাজ ভবঘুরেমি কে ভয় পায় এবং তরুন-তরুনীদের নিষেধ করে বা বাধা দিয়ে থাকেন পরিজনেরা। অথচ মানবজাতির পুরো ইতিহাস-ই আসলে ভবঘুরেমির ইতিহাস। আফ্রিকা থেকে ঐযে হাটা শুরু করেছিলো, মাত্র ১২০০০ বছর আগে থেকে শুরু করেছে একত্রে পরিবার-গত্র-সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা। অর্থাৎ কম করে হলেও ৫০,০০০ বছর মানুষ ছিল ভবঘুরে, ঐ নেশা-স্কিল তো আর মানুষের জীন থেকে চলে যায়নি। নাহলে এখনও মানুষ অন্ধকারে ভয় পায় কেন? এখন রাতের দুনিয়ায় কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্য কোন বন্য প্রাণীর ভয় নাই তারপরও আমরা অনেকটা জীনগত প্রোগ্রাম হয়ে আছি অন্ধকার কে ভয় পাওয়ার। এখনও আমরা আফ্রিকার সেইসব বিভীসিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি অবচেতন মনে নিয়ে ঘুরছি। তাই আমরা অজানা কে ভয় পাই, অজানা স্থানে যেতে ভয় পাই, তা অবশ্য আগের মানুষও পেত, কিন্তু তাদের ভয় পেলেও যেতেই হত প্রয়োজনের নিমিত্তে। আমাদের বিস্তর সুযোগ-সম্ভাবনা সত্ত্বেও আমরা যাইনা নতুন নতুন জায়গায়। এক বাড়িতে পরিবারের সাথেই সারাজীবন ভোগে মত্ত থেকে সুখে-দুঃখে-শান্তিতে-অশান্তিতে মারা যাই। প্রাচীনকালে মানুষদের পরিবারকে বাঁচানোর জন্যই সর্বদা স্থান পরিবর্তন করতে হত যা এখন আর প্রয়োজন পরছে না আমাদের। যেহেতু অন্য সকল প্রাণীর মতই আমাদের প্রধান কোডিং হচ্ছে যেভাবেই হোক বেঁচে থাকতে হবে এবং উর্বর সন্তান রেখে যেতে হবে। তা এক যায়গায় থেকেই যদি সম্ভব হয় তাহলে কেন অন্য কোথাও যাওয়া, তারপর আবার এই যায়গা যদি হয় বিপদমুক্ত হয় তাহলে তো না যাওয়াই যৌক্তিকভাবে উচিৎ। এই এভলুশনারি সুবিধার জন্যই মানুষ নিজেদের আদিম ভবঘুরেমির নেশা ত্যাগ করে স্থির-মানব সমাজ সৃষ্টি করেছে, যার সবচেয়ে কার্যকরী এবং দীর্ঘস্থায়ী আঠা হচ্ছে ধর্ম আর অর্থনীতি। প্রায় সকলেই ঐ নেশার টান কিন্তু মাঝেমাজেই পান, খুব কম ছেলে-মেয়ে অস্বীকার করতে পারবে, যে সে কখনই “ঘরবাড়ি ছেড়ে-ছুড়ে দূরে চলে যাই” আবেগ অনুভব করে নাই। কিন্তু আমরা নিজেদের টিভি, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, নেটফ্লিক্স, মার্কেট, ডেটিং ইত্যাদি অহেতুক-সময়-অপচয়কারী ব্যবস্থায় মগ্ন করে রেখেছি যা আমাদের সবসময় ভুলিয়ে রাখে এই মানবিক আবেদনকে প্রত্যাখ্যান করতে।
মানুষ এখন প্রকৃতার্থে আর ভবঘুরেমি করেনা। যারা ঘুরাঘুরি করে তাদের অধিকাংশই মূলত আনন্দ-প্রমোদভ্রমণে গিয়ে থাকেন যা সত্যিকার অর্থে ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য পূরণ করে না। সমাজের মানুষ বেশিরভাগই যুক্তি দিয়ে নিজেদেরকে চার দেয়ালে আটকে রাখে জীবনভর। অথচ সেসব যুক্তির উর্ধ্বে উঠে বা অতিক্রম করে তরুন-তরুনীরা বিশ্ববিদ্যালয় পার বা স্বশিক্ষিত হয়ে শিক্ষিত হয়ে ঘর ছাড়ার অনিশ্চিত পথে যাত্রা করা উচিত।
অনিশ্চিত পথের ভবঘুরেমি তথা যাত্রার অভিজ্ঞতা আমাদেরকে ঋদ্ধ করে। ভবঘুরের উচ্চ আদর্শ সম্পন্ন হওয়া উচিত কারণ তাঁর দ্বারা সমাজের, মানবজাতির উন্নতি সাধন হলেই তবে জীবনের সার্থকতা।




Comments