চিঠি
- Subrata Shuvro
- Jun 25, 2022
- 3 min read
Updated: Jun 28, 2022
প্রতি
প্রিয় ডাকবাক্স,
অনেকদিন পর চিঠি লিখতে বসেছি। মনে আছে তোমার? আমাদের শৈশবে কত ঝকমকে ছিলো সবকিছু?
আজকাল আমার মন ছবিতে, পুরোন ছবি ভেসে
উঠে, শৈশবের... শুক্কুরবারের সকালটা? নিনজা টারটেলস, বা, টারজান লাফিয়ে বেড়াচ্ছে গাছে গাছে। সাথে চাচা চৌধুরী, তিন গোয়েন্দা বা
ফেলুদা। পড়ার বইয়ের ফাঁকেফাঁকে, দূর থেকে
ভেসে আসতো, ফেরীওয়ালার ডাক
“এই আছে...., পুরনো শিশি বোতল ভাংগা
গড়া হাড়ি পাতিল...”
অথবা বেদেনীর ডাক
“এই লেইস ফিতা, লেইস....চুড়ি, দুল, নাকফুল....”
এইসব চরিত্র গুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে
আজ? পাড়ার মোড়ে একটু উঁচু, জায়গার উপর বসে
নাপিতের কাছে চুল কাটতে বসা। হারিয়ে গেছে, দশ পয়সার লজেন্স, এক টাকায় ১০ টা ফুচকা, হারিয়ে গেছে টিফিন এর ফাঁকে গোল্লাছুট, গাছে চড়া।
হারিয়ে গেছে ইশকুলে বৃহস্পতিবারের বিচিত্রা ক্লাস।
হারিয়ে গেছে ডাকপিয়নের ডাক,
"চিঠি, চিঠি..."
হ্যাঁ, চিঠি'র কথা ভাবতেই এক অন্যরকম ভালোলাগা ও আবেগাপ্লুত হয়ে পরি আমি। স্কুল বা কলেজ জীবন অব্দি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকেও চিঠি লিখার অভ্যেসটা ছিলো। পরবর্তীতে মাঝে মাঝে চিঠি পেতে ইচ্ছে হতো, চিঠিও লিখতো কিছু বন্ধু। লিখেছি আমিও বন্ধুদের। অনেককাল হলো এখন আর লিখা হয় না কাউকে। আজকাল চিঠি লিখার আবেদনটাই হারিয়ে গেছে একেবারেই। চিঠির খাম কেনা, গুটি গুটি অক্ষরে চিঠি লিখা, লিখে সেটা আবার পোস্ট করা, চিঠির উত্তরের জন্য অপেক্ষা, চিঠি পেলে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠা মন। এই আবেগ ও অনুভূতি গুলোই আজকাল হারিয়ে গেছে যন্ত্রদানবের করালগ্রাসে।
ঝকঝকে এই দুনিয়ার
ও সহজ ভালোবাসায় হারিয়ে
গেছে দুর্লভ ভালোবাসা, হারিয়ে গেছে অনেক কিছু...
প্রিয় ডাকবাক্স,
কত হারানো
পেরিয়ে আমরা, বড় হয়েছি
‘ঝকমক', হয়েছি
প্যানাফ্লেক্স ডিজিটাল দুনিয়ায় ঢেকে গেছে, হারানো দিনগুলো
হারিয়ে গেছে, হারিয়ে অনেক কিছুই
ঝকমকে আঁধার পৃথিবীতে, হারিয়ে আমরা,
শৈশব হারিয়ে, ঝকমকে আঁধারে।
ডাকবাক্স, সেই আঁধারে তুমিও আজ বাঁধ ভাঙ্গার প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া,
লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া গ্রাম বা শহরের মত
তুমিও প্রায় বিলীন হয়ে গেছো।
সময়ের বেত্রাঘাতে শব্দ ও অনুভূতিশীলতার পিঠে
আঁচড় দিয়ে এ সভ্যতা তোমাকে আর
টিকে থাকতে দেয়নি,
যান্ত্রিক সভ্যতার দানবীয় গহ্বরে
একটু একটু করে হারিয়ে গেছে, যাচ্ছে তোমার অস্তিত্ব।
৩০ জানুয়ারি, ২০১৬
প্রিয় স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী বন্ধুরা,
তোমরা দেখিয়ে দিয়েছে, নাড়িয়ে দিয়েছে এ মানুষ-সমাজ তথা দেশ ও রাজনীতিকদের। তোমাদের অধিকার আদায়ের পথে তোমরা দেখেছো কিভাবে স্বার্থান্বেষী মহলগুলো তাদের নির্লজ্জ নিজ নিজ দলীয় স্বার্থবাদী চক্রান্তে তোমাদের যৌক্তিক অধিকার আন্দোলনকে কিভাবে ভূলুণ্ঠিত করছে। একদিকে শাসকদল দলীয় সন্ত্রাসীদের ও রাষ্ট্রীয় পেটোয়াবাহিনীদের দিয়ে তোমাদের নির্মমভাবে পেটানো হলো, রক্তাক্ত করা হলো এবং আরেকদিকে গুজব রটিয়ে বিভিন্ন কৌশলে বিএনপি-জামাত পাঙ্গরা তোমাদেরকে শাসকপক্ষের সাথে সাংঘর্ষিক জায়গায় নিয়ে তোমাদের যৌক্তিক অধিকারের আন্দোলন এবং তোমাদের অমূল্য জীবনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে এতটুকু পিছপা হয়নি। আর এ সুযোগে তোমাদের এ গণদাবীকে ভিন্ন সেন্টিমেন্ট দিয়ে ব্যাখ্যা করে সরকারপক্ষ সমগ্র আন্দোলনের মোটিভকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া হলো।
এ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (বিশেষকরে আ:লীগ, বিএনপি-জামাত এবং তাদের অংশীদারি দলগুলো) এতোটাই অমানবিক যে তোমাদের, মানুষের অধিকারের কথা ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তারা তোমাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে দ্বিধা করেনি। যা কোন সভ্য সমাজের কর্মকান্ড নয়।
তোমরা জেনেছো মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে এই দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু তোমরা এও দেখছো-জেনেছো মানুষের বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, মুক্তচিন্তার চর্চা বারবার কিভাবে প্রতিটি শাসকদলগুলোর রোষানলে পরেছে; মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে বারংবার পাহাড়-সমতল-উজানে-ভাটিতে। এদেশের কর্তৃত্বপ্রবণ রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে শাসনের প্রধান হাতিয়ার মিথ্যাচারীতা, বলপ্রয়োগ, ভয়, জবরদস্তির মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা। এ সকল দলই রাষ্ট্র, সমাজ ও সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর মরন ব্যাধি।
তোমরা নিশ্চয়ই ভবিষ্যৎ-এ এসব নির্লজ্জ রাজনৈতিক দলগুলো ও গোষ্ঠীগুলোর হাতে সমাজ-রাষ্ট্র চলতে দিতে চাওনা?
নিজেদের প্রস্তুত করো, তোমরা প্রত্যেকে নিজেদের পরিবার, তোমাদের ও সমাজের আশেপাশে শুদ্ধি অভিযান শুরু করো। বাবা-মা’য়ের আয়ের উৎস এবং আয়ের সাথে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা খুঁজে বের করো। তাদের অন্যায় ও ভুল ধরিয়ে দাও, তাদের এবং সমাজের যেকোনো স্তরের দুর্নীতি ও নিপীড়ন এর বিরুদ্ধে তোমরা সোচ্চার হও। তোমরা প্রস্তুত হও, নিজেদেরকে তৈরি করো। তোমরা সুন্দর মানবিক সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বিনির্মান এর জন্যে প্রস্তুত হও। সর্বোপরি সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত; ঘুণেধরা, পচে যাওয়া, পিছিয়েপরা এই অমানবিক সমাজ টা’কে ধুয়েমুছে 'মানবিকতায় আধুনিক উন্নত' সমাজ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে, সকলকে নিয়ে একসাথে, একযোগে সততার সাথে কাজ করতে হবে। তোমাদের আলোর পথযাত্রী হয়ে, নিজেদেরকে মানবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করে, এ সমাজের বাতিঘর হয়ে এগিয়ে যেতে হবে মানবিক সমাজ গঠনের মহান কাজে। এই প্রত্যাশাই থাকবে তোমাদের প্রজন্মের কাছে....
তোমাদের একজন অকৃত্রিম বন্ধু,
সুব্রত শুভ্র
৭ আগষ্ট, ২০১৮।




Comments